পঞ্চ প্রয়াগ, উত্তরাখণ্ড।



একাধিক নদীর মিলনকে প্রয়াগ বলা হয়। গাড়োয়াল হিমালয়ের পঞ্চপ্রয়াগ হিন্দু তীর্থযাত্রীদের কাছে খুবই পবিত্র।  পাশাপাশি এর প্রকৃতিক মনোরম পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। হরিদ্বার থেকে সরাসরি বদ্রীনাথের যাত্রাপথের ধারেই পঞ্চপ্রয়াগের অবস্থান।  দেবপ্রয়াগ,  রুদ্রপ্রয়াগ,  কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ ও বিষ্ণুপ্রায় --------- এই হল পঞ্চপ্রয়াগ। 

পঞ্চপ্রয়াগ : শতোপনথ হিমবাহ আর ভগিরথী খরক হিমবাহ থেকে বেরিয়ে অলকানন্দা পরপর পাঁচটি বড় নদীকে বুকে টেনে নিয়েছে তার ২০০ কি মি যাত্রাপথে --- বিষনুপ্রয়াগে ধৌলিগঙা, নন্দপ্রয়াগে নন্দাকিনী, কন'প্রয়াগে পিন্ডার, রুদ্রপ্রয়াগে মন্দাকিনী আর শেষে দেবপ্রয়াগে ভাগিরথী।

                       বিষ্নুপ্রয়াগ





আকাশি রঙের বিষুগঙ্গা এসে গৈরিক অলকানন্দার সাথে মিশেছে।জোশীমঠ পাহাড়ের ওপরে -- উচ্চতা ৬২০০ ফুট, বিষনুপ্রয়াগ পাহাড়ের পাদদেশে--- উচ্চতা ৪৫০০  ফুট। আঁকা বাঁকা উতরাই ভাঙতে হয় নীচে নেমে আসার জন্য। এখানে একটি প্রাচীন বিষ্নু মন্দির আছে। কথিত আছে বিষ্নুপ্রয়াগে নারদ তপস্যা করছিলেন ও বিষ্নু তাকেঁ দর্শন দেন।

সঙ্গমকে বলে বিষ্নুকুন্ড। ব্রহ্মা তাঁর মানসপুত্র নারদকে আদেশ করেছিলেন সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে। নারদ ভাবলেন সৃষ্টির মত সৃষ্টিছাড়া কাজে মেতে থাকলে বিষ্নু সাধনা ব্যাহত হবে। তাই তিনি ব্রহ্মার কথায় রাজী হলেন না। ব্রহ্মা গেলেন রেগে। শাপ দিলেন নারদকে । তাকেঁ নিতে হল মানবজন্ম। মানুষ হয়েও কিন্ত নারদের বিষ্নুভক্তি গেল না। বিষ্নুর তপস্যা করতে তিনি এলেন  এখানে। তন্ময় চিত্তে তপস্যারত রইলেন বহুকাল।  তপোমুগ্ধ বিষ্নু ত্রিলোকের হিতার্থে ব্রহ্মঞ্জান দান করলেন নারদকে। সেদিন থেকে দেবর্ষি নারদের এই সার্থক সাধনভূমি পরিনত হল পুণ্যপ্রয়াগে______ বিষ্নুতীর্থ বিষ্নুপ্রয়াগ। 

সৌন্দর্যের বিচারে বিষ্নুপ্রয়াগ হিমালয়ের রমণীয়তম সঙ্গম। প্রচন্ড বেগে নেমে আসা অলকানন্দা, উন্মত্ত আবেগে আলিঙ্গন করছে বিষ্নুগঙ্গাকে  তাদের মিলনানন্দে আনন্দিত হয়ে উঠেছে বিষ্নুপ্রয়াগ।  সেই মিলনগীতি পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে সামগীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখানে এসে দাড়ালে যে সামগীতি শ্রবন করে, সঙ্গম দর্শন করে, স্বর্গবারি স্পর্শ করে ---- তার মর্ত্য জীবন ধন্য হয়।

                     নন্দপ্রয়াগ

নন্দাকিনী ও অলকানন্দার মিলনভূমি এই পুন‍‍্য প্রস্থানের নাম হয়েছে নন্দ প্রয়াগ। পান্ডারা বলে--- এই প্রয়াগে স্নান করলে সব'পাপ মুক্ত হয়।

কর্নপ্রয়াগ



অলকানন্দা এসেছে উওর পূর্ব থেকে। দক্ষিন পূর্ব থেকে --- কন'গঙ্গা বা পিন্ডারগঙা। মিলিত ধারা ধেয়ে চলেছে পশ্চিমে। সে ধারার নামও অলকানন্দা।

রুদ্রপ্রয়াগ



কেদারনাথের মন্দাকিনী এসে বিলীন হয়েছে বদ্রীনাথের অলকানন্দায়।  স্ফটিক স্বচ্ছ  মন্দাকিনি মিলেছে চন্দন-বর্না অলকানন্দায়। দুয়ে মিলে প্রশস্ততর হয়েছে। মন্দাকিনী নাম গেছে মুছে।পাহাড়ী জনপদ রুদ্রপ্রয়াগ।  কঠিন পাহাড়ে ঘেরা । পাহার শান্ত ও সুন্দর। নিশ্চল ও নিথর। কিন্তু নীরব নয়। রুদ্র প্রয়াগ হল রাগ-রাগিনীর জন্মভূমি।

পরম পুন্যক্ষেত্র এই অলকানন্দা ও মন্দাকিনি সঙ্গম।  কেউ কেউ এই সঙ্গমকে বলে সূর্যপ্রয়াগ। দেবর্ষি নারদের তপস্যাক্ষেত্র। কথিত আছে ------- গয়ারাজের যঞ্জে অসন্তুষ্ট পরশুরামের পাপে যে দু'লক্ষ ব্রাহ্মণ ব্রহ্মরাক্ষসযোনী প্রাপ্ত হয়েছিলেন , তারা এই সঙ্গমের পূন্য সলিলে স্নান করে শাপ মুক্ত হন।  হরিদ্বার,  ৠষিকেশ ও দেবভূমি দেবপ্রয়াগ দেখে,  আসতে হয় এখানে। আর এখান থেকেই কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের যাওয়ার রাস্তা আলাদা হয়েছে। 

                                  দেবপ্রয়াগ

 


দেবভূমি দেবপ্রয়াগ গিরিরাজ হিমালয়ের পঞ্চ প্রয়াগের শ্রেষ্ঠ প্রয়াগ। সতোপন্থ হিমবাহ থেকে আসা মন্দাকিনি ও অলোকানন্দার মিলিত ধারার সঙ্গে গোমুখ থেকে আসা ভাগীরথীর মিলন ঘটেছে হৃষীকেশ থেকে ৭১ কি মি দূরে ১৭০০ ফুট উঁচু দেবপ্রয়াগে। প্রায়াগের পবিত্র জলে স্নানে পূন্য হয়।গঙ্গা নামের উৎপত্তিও ত্রিধারার এই মিলন থেকে দেবপ্রয়াগে।  এলাহাবাদের সঙ্গমের পরেই এর স্থান।

কথিত আছে শ্রীরামচন্দ্র নাকি অনেক শিবলিঙ্গ স্থাপিত করেছিলেন এখানে। বিশ্বেশ্বর শিব হল তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।  এই শিব দর্শন না করলে তীর্থযাত্রা বিফল হয়। শিবতীর্থ পেরিয়েই ভাগীরথী-অলোকানন্দার সঙ্গম।  উদ্দাম আবিল ভাগীরথীর ধারা অলকানন্দার শান্ত সুনীল জলধারায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বামণ অবতার যখন তিন পায়ে ত্রিভুবন অবরোধ করেছিলেন তখন তাঁর পায়ের নখ থেকে নি:সৃত হল এক জলধারা। সেই ধারা ধ্রুবমন্ডল ও সপ্তর্ষিমন্ডলহয়ে ব্রহ্মলোকে মেরুশৃঙ্গে পতিত হল। বিভক্ত হল চার ধারায়। সীতা, ভদ্রী, চক্ষু ও অলকানন্দা। অলকানন্দা এলেন দক্ষিণে --- গিরিরাজ হিমালয়ে। শিব তাকে ধারন করলেন  জটাময় মস্তকে। শিবকে প্রসন্ন করলেন ভগীরথ।  গঙ্গাকে নিয়ে চললেন মর্ত্যলোকে। পথে গঙ্গাধারা দ্বিধাবিভক্ত হল। সেই দুই ধারার পুনর্মিলন  হল এখানে ----- এই দেবপ্রয়াগে।

পুরাণ ঘাটলে আমরা পেয়ে যাই সেই পূন্যকাহিনী------
---- মানস সরোবরের তীরে হিমবাহ পর্বত। হিমানীমুকুট পরে দারিয়ে আছে। অবশেষে রাজর্ষি বিশ্বামিত্র এসে থামলেন হিমবানের পাদদেশে। পথশ্রমে কাতর হলেও মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে তিনি তপস্যায় বসলেন।  দেবতাদের আসন টলে উঠল। তারাঁ বিচলিত হয়ে ব্রহ্মার শরণাগত হলেন।  ব্রহ্মার পরামর্শে কিন্নরী পুষ্পমালাকে তলব করলেন।  কিন্নরী এল তার  বিশ্বজয়ী রূপ আর যৌবন নিয়ে। দেবতারা তাকে আদেশ করলেন বিশ্বামিত্রের ধ্যানভগ্ন করতে। কামদেব চললেন কিন্নরীর সঙ্গে। ধ্যানমগ্ন বিশ্বামিত্রের সামনে কিন্নরী নৃত্য-গীত আরম্ভ করল। সমাধিস্থ বিশ্বামিত্রের অঙ্গে ক্রমাগত কাম-কুসুমবাণ নিক্ষিপ্ত হল। 

ধ্যান ভাঙ্গল বিশ্বামিত্রের।  পুষ্পমালা মোহিত হল রাজর্ষির অলৌকিক শক্তিতে। অনুতপ্ত হল তার এই  অসদাচরণের জন্য।  সে দেবতাদের চক্রান্তের কথা প্রকাশ করে দিল। রাজর্ষি তাকে অভিশাপ দিলেন " তোর সর্বনাশী রূপ ও যৌবন ধ্বংস হোক। তুই মকরী হয়ে যা।" মকররূপী পুষ্পমালা রাজর্ষির কৃপাভিক্ষা করল এই বলে " করুণা করুন , হে কৃপাময়! কৃপা করুন, হে কৃপাসিন্ধু!" করুণা হল বিশ্বামিত্রের।  তিনি বললেন " তুমি দেবপ্রয়াগে যাও, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র যাবেন সেখানে , তিনি শাপ মুক্ত করবেন তোমাকে।"  রামচন্দ্র এসেছিলেন এখানে ____ এই দেবপ্রয়াগে। মকররুপী পুষ্পমালা জড়িয়ে ধরেছিল তার চরণযুগল। রামচন্দ্র মকরীর শিরচ্ছেদ করেছিলেন।  মকরী রুপান্তরিত হয়েছিল কিন্নরীতে। কিন্নরী রামবন্দনা করে চলে গিয়েছিল বিষ্নুলোকে। 

কথিত আছে ভগীরথ পিতৃপুরুষের পিন্ডদান করেছিলেন ভাগীরথী ও অলকানন্দার সঙ্গমে -------- গঙ্গার জন্মভূমি এই দেবভূমি দেবপ্রয়াগে। তরল-তরঙ্গনী ভগবতী গঙ্গাবারিতে বিধৌত তীর্থ এই  দেবপ্রয়াগ।  শ্রেষ্ঠ সে স্বর্গীয় মাহাত্ম্যে, শ্রেষ্ঠ সে স্বর্গীয় সৌন্দর্যে। 


Comments

  1. tkr14360@gmail.com
    annaroy330@gmail.com is cancelled

    ReplyDelete
  2. Change of profile of Tapas Kumar Roy who's e-mail tkr14360@gmail.com in lieu of annaroy330@gmail.com

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

রঘুরাজপুর, পটচিত্রের গ্রাম, পুরী।

আদালাজ স্টেপওয়েল

বড়ুভা ----- কুমারীসুলভা এক সমুদ্র সৈকত