ভীমাশঙ্কর জোতির্লিঙ্গ, মহারাষ্ট্র।

জ্যোতির্লিঙ্গ ভীমাশঙ্কর, মহারাষ্ট্র।

শিবপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, বামনপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, পদ্মপুরাণ, কালিকাপুরাণ, মহানির্বানতন্ত এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে শিবলিঙ্গ ও জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি সম্বন্ধে অনেক কথাই লেখা আছে। স্বয়ং শিবাবতার আচার্য শঙ্কর অগণিত লিঙ্গমূর্তির মধ্য থেকে মাত্র ১২ টি শিবলিঙ্গকে জ্যোতির্ময় বলে চিহ্নিত করেন। এই স্বয়ম্ভু লিঙ্গগুলিকেই জোতির্লিঙ্গ বলা হয়। এগুলি হ'ল যথাক্রমে (১) ঝারখন্ডের দেওঘরে বাবা বৈদ্যনাথ (২) বারানসীতে বাবা বিশ্বনাথ (৩) উত্তরাখণ্ডে কেদারনাথ (৪) মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে মহাকালেশ্বর (৫) ওঙ্কারেশ্বরে বাবা ওঙ্কারেশ্বর (৬) তামিলনাডুতে রামেশ্বর (৭) অন্ধ্র প্রদেশের শ্রী শৈলমে মল্লিকার্জুন (৮) গুজরাটে সোমনাথ ও  (৯) নাগেশ্বর (১০) মহারাষ্ট্রের ঘৃষনেশ্বর , (১১) ত্র্যম্বকেশ্বর ও (১২) ভীমাশঙ্কর। এঁদের দর্শনে, পূজনে, স্মরনে মানুষের জীবনে প্রভূত কল্যাণ ও আনন্দ আসে। যিনি প্রত্যহ সকালে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ পাঠ করেন এবং দর্শন করেন তাঁর সাত জন্মের পাপ দূর হয়। এই কারনেই মানুষ শত শত বছর ধরে জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে যান।

মহাদেবের এই " ভীমাশঙ্কর " নাম ধারণের প্রেক্ষাপটে রয়েছে এক পৌরাণিক উপাখ্যান --- --- ---
দশানন ভ্রাতা কুম্ভকর্নের পুত্র হলেন ভীম। শ্রীরামচন্দরের হাতে কুম্ভকর্ন নিহত হবার পর মায়ের সঙ্গে ভীম গভীর অরণ্যে থাকতেন। একদিন তাঁর মা কর্কটিকে এই নির্জন অরন্যে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। রামের হাতের তাঁর পিতা নিহত হওয়ার ঘটনা শুনে ভীম ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে স্থির করলেন, তপস্যা বলে বলীয়ান হয়ে পুনরায় তিভূবনে রাক্ষসরাজ প্রতিষ্ঠা করবেন। ‌‌ভীম হাজার বছর ধরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কঠিন তপস্যায় মগ্ন হলেন এবং ব্রহ্মার বলে বলীয়ান হয়ে স্বর্গপুরী আক্রমণ করে দেবতাদের স্বর্গচ্যুত করলেন। দেবদেবীর পূজা মর্ত্যেও বন্ধ হল। তিনি ঘোষণা করলেন তার পূজো ভিন্ন অন্য কোনোও দেবদেবীর পূজো করা চলবে না। অত্যাচারিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে তপ্ত হয়ে উঠে মর্ত্যের বায়ুমণ্ডল। সেসময় সুদ্খিন নামে এক রাজা শিবভক্ত ছিলেন। তিনি ভীমের আদেশ অমান্য করে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে নির্জন বনের মধ্যে একাকী শিব আরাধনায় রত ছিলেন। ভীমের নির্দেশে রাজাকে কারারুদ্ধ করে অত্যাচার করা আরম্ভ হলো। তবুও তিনি প্রতিদিন কারাগারের ভিতরে মাটির শিবলিঙ্গ গড়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। রাজা সুদ্খিনকে গভীর শিবধ্যানে মগ্ন‌ থাকতে দেখে ভীম বললেন " তোকে হত্যা করে শিব আরাধনা চিরকালের মতো বন্ধ করে দেব।" এই বলে ভীম তরবারি উত্তোলন করে রাজাকে আঘাত করতে যাবে, ঠিক সেই সময় শিবলিঙ্গ থেকে শিব আবির্ভূত হয়ে এক ভয়ঙ্কর রুদ্ররব নি:সরন করলেন। সেই শব্দ ভীম সহ্য করতে না পেরে মাটিতে পড়ে নিহত হলেন। স্বর্গ হতে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগলো। সমস্ত দেবতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন দেবাদিদেব মহেশ্বরের পূজা করার জন্য। রাজা সুদ্খিন করজোড়ে দেবাদিবের কাছে প্রার্থনা করলেন " প্রভু , একবার যখন এখানে আবির্ভূত হয়ে ভক্তকে রক্ষা করেছেন তখন এখানে এই লিঙ্গমূর্তিতেই চিরকাল অধিষ্ঠান করুন।" ভক্তের প্রার্থনায় সেই থেকেই জ্যোতির্লিঙ্গ মূর্তিতে মহেশ্বর রয়ে গেলেন এখানে।

নির্জন জায়গায় মন্দিরকে ঘিরে ছোট জনপদ। এখান থেকে পূজোপকরন কিনে নেওয়া যেতে পারে। দুপাশে সবুজ বনানী। মধ্যিখানে ১৬৫ পাথরের সিড়িপথ সোজানীচে নেমে গেছে। পথের শেষে অপরুপ কারুশিল্প সমৃদ্ধ এক কালো গ্রেনাইট পাথরের ছোট মন্দির। প্রথমে নাটমন্দির এবং পরে গর্ভমন্দির। বড় গৌরিপট্টের মধ্যে মূল ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ। লিঙ্গের মাথায় মধ্যিখানে সামান্য ফাটলের মতো। সেখান দিয়ে অতি খীনধারায় জল পড়ছে। লিঙ্গের একাধারে শিব এবং অন্য ধারে পার্বতি। মধ্যিখানে ভীমানদী। ভীমানদীর নাকি এটাই উৎপত্তি স্থল। খীনধারায় নালা দিয়ে বনপথে চলে গেছে বহুদূরে। মিশেছে কৃষ্ণানদীতে।

মহাশিবরাত্রি, অঘোর চতুর্দশী এবং বৈকুন্ঠ চতুর্দশীতে বহু ভক্ত মন্দিরে আসেন। মেলাও বসে। ভীমাশঙ্কর দর্শনে ও পূজোয় ,মন থেকে ভয় ভাব দূরীভূত হয়। মন হয় আনন্দময়। সমস্ত কর্মে  সিদ্ধি লাভ হয়। গ্রহ বাধা‌ নিবারন ও অকাল মৃত্যু রোধের জন্য কোটি কোটি ভক্ত ভীমাশঙ্করের আরোধনা করে থাকেন।

এই প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র নাসিক থেকে ১১০ কি মি, ঔরাঙ্গাবাদ থেকে ২৩০ কি মি, পুণে থেকে ১২৩ কি মি, লোনাভোলা থেকে ১৪২ কি মি আর শিখগুরু গোবিন্দ সিংহের স্মৃতি বিজড়িত নানডেড থেকে ১০৯ কি মি দূরে অবস্থিত। গাড়িতে সহজেই এখানে আসা যায়।























Comments

Popular posts from this blog

রঘুরাজপুর, পটচিত্রের গ্রাম, পুরী।

আদালাজ স্টেপওয়েল

বড়ুভা ----- কুমারীসুলভা এক সমুদ্র সৈকত