মা সারদা দেবী মন্দির------মাইহার------মধ্যপ্রদেশ

 

মা সারদা দেবী----মাইহার----মধ্যপ্রদেশ





মাইহার ভারতের মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার একটি শহর। শহরটিতে ত্রিকুট পাহাড়ের উপর অবস্থিত মা সারদা দেবীর মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। এটি পূর্বতন মাইহার রাজবংশের রাজত্বের রাজধানী ছিল। এখানেই রয়েছে পন্ডিত রবিশঙ্করের গুরু এবং আলি আকবর খানের পিতা ও শিক্ষা গুরু বিখ্যাত সরোদ বাদক বাবা আলাউদ্দীন খানের বসত বাড়ি। ইনিই হলেন সঙ্গীত শিল্পের "মাইহার ঘরানার " জনক। এছাড়াও বেশ কিছু ভারতীয় ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের জন্মস্থান হিসেবে এই স্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছে।




১০৬৩ টি সিড়ি পেরিয়ে পৌচ্ছাতে হয় এই মন্দিরে। তবে ওপরে উঠার জন্য রয়েছে ভালো রাস্তা ও রোপওয়ে। মসৃণ রাস্তা দিয়ে হেটে সহজেই মন্দিরে যাওয়া যেতে পারে। আর রোপওয়ে তো রয়েছেই। সপ্তাহের সাত দিনেই রোপওয়ে চলে। যাতায়াতের ভাড়া ১৩০ টাকা প্রতিজনে। সারা বছরই ভীড় থাকে পুন্যার্থীদের। নবরাত্রির সময়ে ভীড় আরও বাড়ে। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবী সারদার মূর্তি। মনে করা হয় ষোড়শ শতকে এই মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। এমন মন্দির ভারতে আরও অনেক রয়েছে। তা হলে এর বিশেষত্ব কোথায় ??




সারদা দেবী মন্দির সম্পর্কে রয়েছে এমন কিছু কিংবদন্তি, যা সত্যিই , অবাক করে দেয়। আর বিশেষত্ব হলো _______ স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ৯০০ বছরের পুরনো এক আত্মা নাকি আজও এখানে প্রতিদিন ভোরবেলায় এসে পুজো দিয়ে যায়। 






কী রয়েছে এই কিংবদন্তির মূলে, জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে ৯০০ বছর আগে পৃথ্বীরাজ চৌহানের আমলে। পৃথ্বীরাজ চৌহান এই অঞ্চল আক্রমণ করলে আলহা এবং উদার নামের দুই যোদ্ধা তাঁকে প্রতিরোধ করেন। আলহা ছিলেন সারদা দেবীর পরম ভক্ত। কথিত আছে এই দুইজনে প্রথম এই জঙ্গলে দেবীর দেখা পান। তারা দেবীকে মা সারদা বলে সম্বোধন করেন এবং সেই থেকে " মা সারদা দেবী " বলে সকলের কাছে পরিচিত। মা কে প্রসন্ন করবার জন্য আলহা ১২ বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেন। তাতেও মা তাঁকে দর্শন না দিলে , আলহা নিজের মাথা কেটে মা'র চরণে প্রদান করেন। ভক্তের এই কুরবানী দেখে মা'র হৃদয় মমতায় পূর্ণ হয়ে যায় এবং তার সামনে উপস্থিত হন। তাঁর শির ধররের সাথে যুক্ত করে আলহাকে অমরত্ব দান করেন। সাথে সাথে তাঁকে অর্থাৎ আলহাকের দিনের প্রথম পূজো করবার অধিকার প্রদান করেন। সেই থেকে অমর আলহা এই মন্দিরেই অবস্থান করছেন এবং রোজদিন সকালে মন্দিরে ঢুকে মায়ের মূর্তি কে স্নান করিয়ে তিনিই প্রথম পূজা করেন। মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকলেও আলহার আগমনে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না। প্রতিদিন সকালে মন্দিরের দরজা খোলার পরেই চোখে পরে দেবীর পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে টাটকা ফুল ও মালা। গনবিশ্বাস এই -------- আলহার অমর আত্মাই এই কাজটি যুগ যুগ ধরে করে আসছে। তাঁকে দেখা যায় না, কিন্তু তাঁর পূজোর ফুলকে সবাই দেখতে পান।



আলহার কাহিনী সত্য কি সত্য নয় , সেটা বড় কথা দাঁড়ায় না, যখন শোনা যায় এই মন্দির আসলে ৫১ সতীপীঠের একটি।

এ বিষয়ে পুরান ঘাটলে আমরা পেয়ে থাকি --------- দক্ষ রাজার নিষেধ সত্ত্বেও সতী, শিবকে বিবাহ করেন।  এই সময় দক্ষ এক বিরাট যঞ্জের আয়োজন করেন  এবং তাতে সব দেবতা আমন্ত্রিত হলেও  শিবকে আমন্ত্রন করলেন না। এতে সতী অপমানিত হয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিলেন।  মহাদেব এই খবর পেয়ে খুব রুষ্ট হয়ে সতীর মৃতদেহ কাধে নিয়ে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ধ্বংসের উদ্দেশ্য নেমে পড়লেন।  তখন সব দেবতা এই ধ্বংসলীলা থেকে মহাদেবকে বিরত করবার জন্য বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন।বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ ৫১ খন্ডে খন্ডিত করে ফেললেন।  এই ৫১ খন্ড যেখানে যেখানে পড়ল সেখানে সেখানে শক্তিপীঠের সৃষ্টি হ'ল। মাইহার হলো এমন একটি জায়গা যেখানে সতীর গলার হার পরেছিল বলে বিশ্বাস করা হয় এবং তাই এটি একটি পীঠ বলে বিবেচিত।  হিন্দীতে "মাই" কথার অর্থ  "মা" এবং "হার " 

হল গলার হার।  সেই সময় থেকে এই জায়গার নাম হয় "মাইহার "। আবার  "সারদা" নামও দেবীর অনেক নামের মধ্যে একটি।





আলহার আখড়া ঠিক মন্দিরের পেছনেই রয়েছে। সেখানে তিনি কুস্তি করতেন।  তার পাশেই রয়েছে আলহা পুকুর।  কুস্তির পর তিনি সেখানে স্নান সারতেন। পুকুরের পাশেই রয়েছে আলহা মন্দির যেখানে আলহার মূর্তি স্থাপিত করা হয়েছে। এ সবই  এখনকার এক একটা দর্শনীয় স্থান। 

সারা বছরের যে কোন সময় এখানে যাওয়া যায়। রেলে মাইহার ষ্টেশনে নেমে অল্পদূরে গাড়ী করে সব জায়গাগুলি একে একে দেখে নেওয়া যায়। মাইহার রেলওয়ে ষ্টেশনটি পশ্চিম মধ্য রেলের সাতনা ও জব্বলপুরের মধ্যে অবস্থিত। শহরটি সড়ক পথে সাতনা বা জব্বলপুর থেকে দেখে নেওয়া যেতে পারে। জব্বলপুর থেকে ১৫৯ কি মি আর সাতনা থেকে ৪২ কি মি দৃরে এই শহরিট অবস্থিত। 










Comments

Popular posts from this blog

রঘুরাজপুর, পটচিত্রের গ্রাম, পুরী।

আদালাজ স্টেপওয়েল

বড়ুভা ----- কুমারীসুলভা এক সমুদ্র সৈকত