সোনালী মরুতে শিক্ষার আসর

 

$$ সোনালী মরুতে বিস্ময়কর স্থাপত্য  $$



জয়সালমের, যাকে আমরা " গোল্ডেন সিটি " বলে ডাকি, ভারতের রাজস্থান রাজ্যের একটি শহর যা কিনা জয়পুর থেকে 575 কি মি দূরে। শহরটি হলদে বেলেপাথরের একটি শহর যার মাথার মুকুট হিসাবে দাড়িয়ে রয়েছে জয়সালমীর দূর্গ। শহরটি থর মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।  1156 রাওয়াল জয়সাল দ্বারা জয়সালমীর প্রতিষ্ঠিত।  জয়সালমের  মানে জয়সালের দূর্গ। জয়সালমেরকে ভারতের সোনার শহর বলা হয় কারন দূর্গ আর নীচের শহরের স্থাপত্য জুড়ে হলুদ বেলেপাথরের ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি নির্দিষ্ট সোনালী হলুদ আলোয় আচ্ছন্ন করে। 








এই জয়সালমেরর গ্রামীন থর মরুভূমিতে রয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল। স্কুলে কিন্ডারগার্ডেন থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় 400 জন ছাত্রী বিনাবেতনে পড়াশুনা করতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এখন চতুর্থ শ্রেণি অবদি প্রায় 110 জন ছাত্রী পড়াশুনা করে। এখন চারজন মহিলা শিক্ষিকা এবং একজন প্রিন্সিপাল রয়েছেন।  স্থানীয় কারিগররা হাতে কাটা স্থানীয় বেলেপাথর দিয়ে স্কুলটি তৈরী করেছেন। স্কুলটি যে অনন্য স্থপতিরা এটিকে ডিম্বাকৃতি আকারে ডিজাইন করেছেন যা 50 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। স্কুলের লক্ষ্য হলো ঐতিহ্যগত দক্ষতা যেমন ব্য়ন, শৈল্পিকতা এবং মহিলাদের জন্য সূচিকর্মে শিক্ষা ও প্রশিক্ষন দেওয়া।






তবে প্রশ্ন জাগে  জয়সালমেরে কেন স্কুল তৈরী করা হয়েছিল? উত্তরে বলা হয় যে রাজস্থান ভারতের তৃতীয়  বৃহত্তম রাজ্য। এখানে পুরুষদের সাক্ষারতার হার 79.19% আর মহিলাদের 52.66%। তাই মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার প্রচার করা ও নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধিই  এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।  অনেকে আবার প্রশ্ন তোলেন  স্কুলের এইরকম নামকরণের উদ্দেশ্য কি  ?  তাদের বোঝানো হয় যে ছাত্রীদের মধ্যে  আত্মবিশ্বাস ও সাহস তৈরী করাই হলো এর মূল উদ্দেশ্য। রাজকুমারী রত্নাবতী সম্পর্কে বলা হয় যে তাঁর বাবা মহারাওয়াল রতন সিং যখন রামপ্রসাদ ছেড়ে যুদ্ধে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বাবার  অনুপস্থিতিতে প্রসাদ রক্ষা করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন এবং তাঁকে চিন্তা করতে মানা করেছিলেন। পরে দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজীর সেনাবাহিনী আক্রমণ করতে এলে তিনি চিৎকার করে বলেন যে "আমি একজন নারী, কিন্ত দূর্বল নই। আমারও  পুরুষদের মতো সাহস আছে।"  পরবর্তীকালে শত্রুর হাত থেকে প্রসাদ রক্ষা করে এই বিষয়টি প্রমাণ করেছিলেন।  তিনি মুঘল সেনাপতি কাফুর সহ 100 জন সৈন্যকে নিরাপত্তার সাথে বন্দী করেছিলেন। 







গ্রামের নাম  কনোই। স্কুলটি স্থাপনের ধরন এমনই মনে হবে একটি ডিম্বাকৃতির কাঠামো মরুভূমির ঠিক মাঝখানে বসে আছে। এই  ডিম্বাকৃতির জ্যামিতি নারী শক্তির প্রতীক।  স্কুল বিল্ডিং এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। বাইরের তাপমাত্রার থেকে ক্লাসের তাপমাত্রা 8 থেকে 10 ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে।









জয়সালমেরর রাজা ছিলেন মহারাওয়াল রতন সিংহ। তাঁর মেয়ের নাম ছিল রত্নাবতী। এই রাজকন্যার নামেই এই স্কুলের নামকরণ হয়েছে। জয়সালমেরর রাজপরিবার এবং মানববন্ধন সিং শেখায়ত স্কুলের জমি দান করেছিলেন।  ডায়মন্ড কেলোগ আর্কিটেক্টস , CITTA FOUNDATION,   নিউইয়র্কের একটি অলাভজনক সংস্থার সহযোগিতা স্কুল নির্মানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সংস্থার প্রধান হলেন শিল্পী মাইকেল ডাউব। জ্ঞান কেন্দ্র নামে সমগ্র এলাকার তিনটি অংশ আছে।  বিদ্যালয়টি এর একটি অংশ । মেধা হল নামে স্থানটিতে রয়েছে একটি লাইব্রেরি এবং মিউজিয়ামের জন্য মনোনীত একটি এলাকা এবং টেক্সটাইলের মতো স্থানীয় কারুশিল্পের পারফরমেন্স এবং  শিল্প প্রদর্শনীর একটি জায়গা। স্থানীয় মহিলারা এখানে বুনন এবং সূচিকর্ম কৌশল শিখতে পারেন।  তাই এই বিস্ময়কর স্থাপত্য  জ্ঞান কেন্দ্র শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য রাজকুমারী রত্নাবতী স্কুল নয় বরং একটি সমবায়ও রয়েছে যার লক্ষ্য হলো মহিলাদের ক্ষমতায়ন  করা। কারুশিল্পে কর্মসংস্থানের উন্নতি সাধন করা। এর ডিম্বাকৃতি রূপটি স্থানীয় দূর্গের বক্ররেখার আকার এবং নারী শক্তির সার্বজনীন প্রতীককে প্রতিফলিত করেছে। মোটের উপর আজ চিন্তা ফাউন্ডেশনের জ্ঞানকেন্দ্র একটি স্থাপত্য বিস্ময়।











এখানকার ছাত্রীরা যে পোশাকটি পরে তা বিখ্যাত ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় ডিজাইন করেছেন।  একটিতে রয়েছে আজকর মুদ্রার মতো স্থানীয় মুদ্রন কৌশল। এছাড়া রয়েছে ছাদের ও উঠানে বৃষ্টির জল সংগ্রহের  ব্যবস্থাও।  সেই সব জল স্কুল বিল্ডিং এর নীচে ট্যাঙ্কে সংগ্রীহিত করা হয়। ছাদে রয়েছে সোলার প্যানেল। সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সেই বিদৄতের সাহায্যে সংগ্রীহিত জল সংশোধন করে পুর্নব্যবহার করা হয়। তবে চলুন জয়সালমের থেকে থর মরুভূমি দেখতে যাওয়ার পথে  শহর থেকে প্রায় 35 কি মি দূরে প্রধান রাস্তা থেকে ডান দিকে কয়েকশ মিটার এগোলেই পেয়ে যাবেন এই বিস্ময়কর স্থাপত্য। সত্যিই বিস্ময়কর স্থাপত্য কিনা নিজের চোখে দেখেই বিচার করবেন !!!









Comments

  1. শ্রীমতি সন্ধ্যা বোসের মন্তব্য::

    অসাধারণ লেখা ও স্কুলের স্থাপত্য দেখে ও পড়ে মুগ্ধ হলাম।আগামী দিনে আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ রইলো ধন্যবাদ।

    ReplyDelete
  2. শ্রীযুক্ত শচী বিলাস রায়ের মন্তব্য

    তথ্যবহুল লেখা। অনেক কিছু জানতে পারলাম, খুবই ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  3. Mrs Kajal Roy commented in this manner -------

    Emon samridhha lekha pore khuub valo lagchhe proud of u

    ReplyDelete
  4. শ্রী কল্লোল বসু এই রকম মন্তব্য করেছেন ::::::::

    অসাধারণ লেখা বললেও কম বলা হয়। ভ্রমন এর ওপর এত তথ্য ভিত্তিক লেখা আমি খুব
    কম পড়েছি সেই সাথে ছবি
    মা এক অন্য মাত্রা এনে দেয়।
    যে কোনো ভ্রমণ বিলাসী মানুষ এর কাছে এ অন্য মাত্রা
    পাবে।
    এক কথায় অতুলনীয় উপস্থাপনা ও গ্রন্থনা। মে
    কোনো ভ্রমণ পত্রিকা তে
    এ লেখা নিজের জায়গা
    করে নেবে
    আন্তরিক অভিনন্দন সহ
    কল্লোল বসু
    21/11/2022

    ReplyDelete
  5. Mr Raren Chakraborty has told in this fashion====
    Onek kichu jante parlam.
    Osadharon bornona ,onek thothyo sambridha. Khub bhalo laglo.

    ReplyDelete
  6. Mr Raren Chakraborty has told in this fashion:::::


    Onek kichu jante parlam.
    Osadharon bornona ,onek thothyo sambridha. Khub bhalo laglo.

    ReplyDelete
  7. শ্রী সুভাষ নন্দী বলেছেন ---

    গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

রঘুরাজপুর, পটচিত্রের গ্রাম, পুরী।

আদালাজ স্টেপওয়েল

বড়ুভা ----- কুমারীসুলভা এক সমুদ্র সৈকত