আদালাজ স্টেপওয়েল
স্থাপত্য বিস্ময়ের বিমূর্ত প্রতীক :~: আদালাজ স্টেপওয়েল :~:
ভারতীয় রাণীরা কেবল তাদের বিস্ময়কর সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত ছিলেন না , তাঁদের অবিশ্বাস্য বীরত্বের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। এখানকার এই বিশেষ রচনাও এক সুন্দরী রানীর প্রেমের গল্প, ত্যাগের গল্প, এক করুন পরিণতি সহ প্রেমের এবং বলিদানের চূড়ান্ত গল্প , যা স্থানীয়রা এখনও স্মরন করে থাকে।
ভারতে অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে যেগুলির পিছনে প্রেমের গল্প (যেমন তাজমহল) বা কিছু দুঃখজনক কাহিনী রয়েছে, তবে গুজরাটের আদালাজ ভাভ একটি অনন্য সাইট যেখানে এটি সবই রয়েছে। আদালাজ স্টেপওয়েল বা রুদাবাই স্টেপওয়েল হল ভারতের গুজরাট রাজ্যের গান্ধীনগরের কাছে আদালজের ছোট্ট এলাকার কাছে অবস্থিত একটি স্টেপওয়েল। গুজরাটি আর মারোয়ারি ভাষায় এই রকম সিঁড়িকে ( জলের স্তরের দিকে নিয়ে যায় এমন ) ভাভ বলে। এটিকে জলের মন্দিরও বলে যেখান থেকে জল সঙগ্রহ করা হয়। সারা দেশে স্টেপওয়েলের বিভিন্ন নাম রয়েছে। উত্তর ভারতে হিন্দিতে এর নাম " বাওলি "। রাজস্থানে এগুলি " কুন্ড " নামে পরিচিত। এছাড়াও এগুলি বিভিন্ন অঞ্চলে 'বাউদি', 'বাউরি" বা 'বাভাদি' নামেও পরিচিত। অনেকে আবার স্টেপড পুকুর বলেও ডাকে। আদালাজের মতো কূপগুলি একসময় গুজরাটের আধা শুষ্ক অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, কারণ এগুলি পানীয়, ধোয়াপোছা এবং স্নানের জন্য জল সরবরাহ করত। আবার এই কূপগুলি বিভিন্ন উৎসব এবং পবিত্র আচার অনুষ্ঠানেরও স্থান ছিল। এই রকম ১২০টিরও বেশী কূপ রয়েছে গুজরাটের আধা শুষ্ক অঞ্চলেই। এর মধ্যে আদালজের কূপটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি একটি বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণ এবং ভারতীয় স্থাপত্যের এক চমৎকার উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে। আহমেদাবাদ শহরের ১৮ কিমি (১১ মাইল) উত্তরে অবস্থিত। এটি রাজধানী শহর অর্থাৎ গান্ধীনগরে থেকে ৫ কিমি ( ৩.১ মাইল ) দূরে।
১৫ শতকের কিংবদন্তী অনুসারে, ভাঘেলা রাজবংশের রানা বীর সিং ,একজন হিন্দু শাসক, এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন যা ভান্ডাই দেশ নামে নামে পরিচিত ছিল। রাজ্য ছিল ছোট। এই ভালো স্বভাবের শাসকের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল তাঁর রাজ্যের বসবাসকারী প্রজারা। রানা বীর সিং এর স্ত্রী ছিলেন রানী রুদাবাই বা রূপবা। তিনি নামের মতোই অত্যন্ত সুন্দরী (নামের অর্থ শক্তিশালী এবং করুণাময়) এবং তিনি সতীত্বের জন্যেও বিখ্যাত ছিলেন। রূপবা রাজার মতো রাজ্যে বসবাসকারী লোকেদের প্রতি অত্যন্ত উদার ছিলেন। জল হ'ল অস্তিত্বের আদিম উৎস। কিন্তু বহু বছর আগে গুজরাটে গভীর ভাবে জল সঙ্কট ছিল। বাড়ীর প্রতিটি মহিলাদের প্রচন্ড গরমে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হত এই জল আনার জন্য। এমন এক অঞ্চলে একটি কূপ নির্মাণ করা ছিল মানুষের কাছে ভগবানের আশীর্বাদের মতো। রানা বীর সিং জলের দুদর্শা দূর করবার জন্য একটি বড় এবং গভীর সোপান নির্মাণ শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্রকল্পটি শেষ হওয়ার আগেই প্রতিবেশী রাজ্যের মুসলমান শাসক মোহাম্মদ বেগদা এই অঞ্চলটি আক্রমণ করে। রানা বীর সিং বেগদার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন । ফলে অঞ্চলটি আক্রমণকারীর হাতে চলে যায়।
বেগদা রানী রুদাবাইয়ের সৌন্দর্যে বিস্মিত হয়েছিলেন এবং তিনি তাকে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তিনি তাকে সতীদাহ করতে বাধা দিলেন এবং যৌতুকের সাথে তাকে বিয়ে করবার প্রস্তাব দেন। যেহেতু রানী রুদাবাই তার স্বামীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন, জনগণের উন্নতির জন্য, প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং একটি শর্ত দেন যে তাকে প্রথমে সোপানটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। বেগদা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান এবং সঠিক সময়ে কূপ নির্মাণের কাজ শেষ করেন। সুলতান রানীকে বিয়ে করবার প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেন । কেননা তিনি সেই সোপানটি সম্পূর্ণ করবার লখ্খ্য অর্জন করছেন। শুধু তাই নয়, বেগদা ঐ স্থাপত্যের উৎকর্ষে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন । তিনি রাজমিস্ত্রীদের জিঞ্জাসা করেছিলেন যে তারা আবার এইরকম কূপ নির্মাণ করতে পারবে কিনা। রাজমিস্ত্রীরা সন্মতি জানালে তিনি তাদের মৃত্যু দন্ড দেন। কেননা বেগদা এই স্টেপওয়েলের প্রতিরুপ কখনই তৈরি করতে চাননি। এদিকে রানী রুদাবাই গ্রামের সাধুদেরকে কূপে স্নান করতে বলেন যাতে জল শুদ্ধ হয় এবং তিনি তার পাপ থেকে মুক্তি পায়। তিনি তার জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্রার্থনার সাথে কূপটি প্রদখিণ করেছিলেন এবং এর পরেই তিনি এই কূপে ঝাঁপ দেন এবং মৃত্যু বরণ করে জীবনের সমাপ্তি ঘটান। এর সাথে সাথেই প্রেম, ভালোবাসা, ত্যাগ, ট্রেজেডির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
সোলাঙ্কী শৈলীর স্থাপত্যে তৈরি আদালাজ স্টেপওয়েল হিন্দু, ইসলামীক এবং জৈন সঙস্কৃতির সঙমিশ্রনে খোদাই করা হয়েছে। এটি ৫ তলা গভীর। বহু সঙখক স্তম্ভের উপর অবস্থিত। দেয়ালে খোদাই করা হয়েছে নারীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করার চিত্র।কূপের ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের গরম তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় পাঁচ ডিগ্রি কম। এটি জল আনতে আসা মহিলাদের এখানে শীতল বায়ুতে আরও বেশী সময় কাটাতে উৎসাহিত করত। তারা অনেকেই দেব দেবীরও আলোচনাও করতেন।স্টেপওয়েলের প্রতিটি তলায় রয়েছে খালি জায়গা। সেখানে কেউ বিশ্রাম নিতে পারে এবং শুয়ে থাকতে পারে। বাম দিকে রয়েছে একটি ছোট দেবী অম্বার মন্দির যা সকলে দেখে নিতে পারেন। রুদাবাই স্টেপওয়েল দেখার জন্য আগে কোনো প্রবেশ মূল্য লাগতো না। কিন্তু এখন ২৫ টাকা করে প্রবেশ মূল্য লাগে। গাইডের কোনো সুবিধা নেই। সপ্তাহের সবদিনই সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে।


























Comment from Haradas Chakraborty ********
ReplyDeleteভীষণ সুন্দর কারুকার্য যা অনেকটা দিলওয়ারা মন্দিরের ভাস্কর্য র সাথে মিল পাওয়া যায়। কূপের পুরো ইতিহাস আমাদের অজানার বাতায়ন খুলে মুক্ত বাতাস আমাদের পরিশীলিত ও ঋদ্ধ করল। পুরো কৃতিত্ব স্নেহাশীষদার প্রাপ্য। এত সুন্দর উপস্থাপনার দ্বারা আমরা মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি। সত্যি তার ধৈর্য্য ও পরিশ্রম ধন্যবাদের যোগ্য। সুস্হ থেকে আমাদের কে এই ভাবে নতুন নতুন ইতিহাস তুলে ধরুন এই কামনা করি। আবার বলি অপূর্ব।
As commented Mr Amit Bhattacharjya ---+++---
ReplyDeleteSo lucidity explained. Excellent clicks ... continue.
শ্রীমতি শোভা বিশ্বাস কি মন্তব্য করেছেন __________
ReplyDeleteশ্রীমতি শোভা বিশ্বাস কি মন্তব্য করেছেন ____________
ReplyDeleteLekha ta pore khooooob bhalo laaglo
শ্রীমতি কাজল রায়ের মন্তব্য দেখুন :::::::::::
ReplyDeleteRani is vava niye ekta lekha chai
Comment of Smt Jhuma Chakraborty -------^^^^^-----
ReplyDeleteকী সুন্দর লিখেছেন স্নেহাশিসদা! সহজ সরল গল্পের মতো পড়লাম। মনে হচ্ছিল সামনে থেকে দেখছি। সত্যি অপূর্ব! ছবিগুলোও অসাধারণ হয়েছে।ধন্যবাদ স্নেহাশিসদা, আপনার প্রত্যেকটা অসাধারণ লেখা পড়ে আর ছবি দেখে কত অজানা জায়গা সম্বন্ধে জানতে পারি। দেখা জায়গাগুলোও মনে হয় নতুন করে দেখছি।
শ্রী নীলেশ মজুমদার মহাশয় লিখেছেন===={=
ReplyDeleteঅনেক কিছু জানতে পারলাম, ভালো লাগলো
শ্রী শচীবিলাস রায় লিখেছেন এই রকম_________
ReplyDeleteঅত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ছবি ও বর্ণনা। খুবই ভালো লাগলো।
শ্রী শুভেন্দু মজুমদারের মন্তব্য *-*-*-*-
ReplyDeleteKhoob sundor Lekha