তারা তারিণী – আদি শক্তির প্রকাশ
হিন্দু সমাজে মাতৃ শক্তির আরাধনা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ঠিক তেমনিই উড়িষ্যার ঘরে ঘরে প্রভু জগন্নাথ দেব পূজিত হলেও উড়িষ্যার অধিকাংশ ঘরে মাতৃশক্তির আরাধ্যা দেবী হিসাবে তারা তারানী পূজিত হন ।
উরিষ্যার গঞ্জাম জেলার ঋষিকূল্য নদীতীরে কুমারী পর্বতে অবস্থিত মা তারা-তারিণীর মন্দির। স্থানীয় লোকেরা ঋষিকূল্যকে গঙ্গার বড়দিদি হিসাবে অভিহিত করে। এটি উড়িষ্যার পবিত্র একটি নদী। পাহাড়ের চূড়ায় সুন্দর পাথরের মন্দিরটিতে মায়ের আবাস। স্বর্ণ ও রৌপ্য অলঙ্কার যোগ করে নৃতাত্ত্বিক আকারে তৈরি করা দুটি পাথর মানুষের মুখের মতো দেখতে যা দেবী তারা এবং তারিণীকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই মন্দিরটি সতী ৫১ পীঠের অন্যতম।কালিকা পুরাণ অনুযায়ী এই স্থানে দেবী স্তন যুগল পতিত হয়। দুটি স্তনরুপিবক্ষশীলা ,একটি তারা, অপরটি তারিণী নামে পূজিত হন (যমজ দেবতা)।এই মন্দিরটি কল্যাণীধাম নামেও পরিচত। এছাড়াও পুরান মতে আমাদের দেশে ৪টি তন্ত্রসাধনার পীঠ আছে তার মধ্যে এই তারা তারিণী মন্দিরটি একটি । এখানে আজও বিভিন্ন তিথিতে তন্ত্রসাধনা করা হয় এবং তন্ত্র সাধকদের সমাগম হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি তন্ত্রবাদের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মন্দিরের ভক্তদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের মহাযান সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন যারা , হিন্দুদের মতো একই তন্ত্র আচার পালন করে। একত্রে যমজ দেবী তারা এবং তারিণী এক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে ।
এই চারটি পীঠের গুরুত্ব আরও ব্যাখ্যা করে, "বৃহৎ সংহিতা" । সেখানেই রয়েছে এই পীঠর অবস্থান ।
"ঋষিকুল্য তটে দেবী
তারকস্য মহাগিরি
তস্য শৃঙ্গ স্থিত তরিণী
বশিষ্ট রাজিতপাড়া"
বিখ্যাত পুরাণ অনুসারে........ কালিকা পুরাণ যেমন বলে, " বিমলা " ( পদ খন্ড ) জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে , পুরী, ওড়িশা, "তারা তারিণী " (স্থান খণ্ড), পুরোষত্তমপুরের এর কাছে , ওড়িশা, "কামাখ্যা " (যোনি খণ্ড) , গুয়াহাটির কাছে আসামে এবং "দক্ষিণা কালিকা " (মুখ খণ্ড) , কালীঘাট, কলকাতার পশ্চিমবঙ্গে মাতা সতীর মৃতদেহের অঙ্গ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।
একটু ইতিহাস ঘাটলে আমরা অনুমান করতে পারি যে এ মন্দির প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরোনো। যদিও এই মন্দিরের সঠিক নির্মাণকাল জানা যায়নি , তবুও পাহাড়ের চূড়ায় তারা-তারিণী মন্দিরের উৎপত্তি নিয়ে অনেক মজার গল্প, পৌরাণিক কাহিনী এবং লোককাহিনী রয়েছে। জনমানসে যে বিভিন্ন কাহানি প্রচলিত আছে সেগুলি এই রকম ........
বাসু প্রহরাজ নামে এক ব্রাহ্মণ তার দুই যমজ বোন (তারা ও তারিণী)সাথে ঋষিকূল্য নদীর তীরে বসবাস করতো।হঠাৎ একদিন ওই দুই বোন এই তারা তারিণী পাহাড়ে এসে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। বাসু প্রহরাজ বহু প্রচেষ্টার পরও তাদের খুঁজে পাননি। সেই রাতে দুই বোন প্রহরাজের স্বপ্নাদেশ দেন যে ওই পাহাড়ে আদি শক্তির মন্দির নির্মাণ করতে ও সেখানে নিত্য উপাসনা করতে। কথিত আছে তার পর এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়।
অন্য আরেকটি কাহিনী এই রকম ::
মৌর্য্য সম্রাট অশোক আর কলিঙ্গের রাজা অনন্তর সৈন্য বাহিনীর মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল তার প্রায় অন্তিমলগ্নে কলিঙ্গরাজ পরাজয় নিশ্চিত বুঝে গুপ্তচর মারফত খবর পাঠিয়ে দেন অন্তঃপুরে,এবং নির্দেশ দেন রানীদের রাজমহল পরিত্যাগের। রানী ও সমস্ত রমণীরা রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়লেন ঋষিকূল্য নদীর ধারে পাহাড়ের উপর তারা তারানী মন্দিরের উদেশ্যে। এই বিপদে দেবীই ভরসা। কিন্তু অশোকের সৈন্যবাহিনী, যারা কলিঙ্গ নগর লুঠপাট করছিলো, তাদের কাছেও খবর পৌছালো রাজ্ রমনীদের পাহাড়ে আত্মগোপনের কথা। অত্যুৎসাহী সৈন্যদল পিছু নিলো রানীদের।ওদিকে রানী ও সমস্ত রমণীগণ আশ্রয় নিয়েছেন মন্দিরের গর্ভ গৃহে। অশোকের সৈন্যদল পৌছালো পাহাড়ের পাদদেশে।অশোকের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে তখন লালসা তীব্র হয়ে উঠেছে। অসুর বিনাশিনী দেবী তারা তারিনীর আবির্ভাব ঘটলো। পথ আটকে দাঁড়ালো ত্রিশূল হাতে এক দেবী। চোখ তাঁর জ্বলছে আগুনের মতো। অগ্নিগর্ভ তেজে এঁটে উঠতে পারলো না অশোকের সৈন্যরা। মন্দিরে ওঠার দুঃসাহস না দেখিয়ে পালিয়ে জীবন বাঁচালেন সৈন্যরা। ওদিকে কলিঙ্গ যুদ্ধ সমাপ্ত হল। চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিণত হলেন রাজা অশোক। সম্রাট অশোকের কানে যখন এই দেবীর কাহিনী পৌঁছায় ততক্ষনে তাঁর বোধোদয় ঘটে গেছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ছেড়ে তাঁর মন তখন বুদ্ধের প্রেমের বাণীতে আকৃষ্ট হয়েছে। মন্দির পরিদর্শনে এলেন স্বয়ং সম্রাট।তিনি নবরূপে মন্দিরটিকে আবার পুনর্নির্মাণ করলেন ,হিন্দু দেবদেবীর পাশাপাশি স্থাপনা করলেন বৌদ্ধমূর্তির।তাই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিকরা দাবি করেন এই মন্দিরের নির্ম্মাণ অশোকের সময়কালে।
এই মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা ৯৯৯ টি সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে সরকারি প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা রোপওয়ের সাহায্যে অনায়াসেই যে কেউ পাহাড়ের তলদেশ হতে পাহাড়ের উপরে অধিষ্টিত মাতৃধামে পৌঁছে যায়(মাত্র ৫৩ টাকা মাথা পিছু টিকিট )।
চৈত্র মাসে এই মন্দিরে বিশেষ পুজো হয়। চৈত্র মাসের প্রতি মঙ্গলবার এই পুজো হয়। তারা-তারিণীর মন্দিরের অন্যতম বড় উৎসব এটি।
প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা অবধি মন্দির খোলা থাকে। টিলার চূড়ায় এবং টিলার পাদদেশে ভক্তরা সোমবার রাত থেকেই ভিড় জমান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মঙ্গলবারকে সবচেয়ে পূর্ণ তিথি বলে মনে করা হয়। এই দু’দিন সবচেয়ে বেশি ভক্ত সমাগম হয়। ভক্তরা গর্ভগৃহে পুজো দেন। এছাড়াও দেবীর উদ্দেশ্যে চুল উৎসর্গ করেন ভক্তরা। দেবী তারা তারিণী নবজাতকদের সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করবেন এই বিশ্বাস নিয়ে ভক্তরা নবজাতক শিশুদের প্রথম চুলের গোছা নিবেদন করতে আসেন। মন্দির থেকে সংগৃহীত চুল প্রক্রিয়াজাত করে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি এবং হংকংয়ে রপ্তানি করা হয়।
টিলার চূড়ায় অনেক নাপিত বসেন। টিলার পাদদেশে কয়েকশো নাপিত বসেন। তারা ভক্তদের চুল কাটেন। সোমবার রাত থেকে চুল কাটা শুরু হয়, যা মঙ্গলবার সন্ধ্যে ছ’টা অবধি চলে। এই সময়ে ভক্তদের বিশেষ খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়।
ব্রহ্মপুর, ভুবনেশ্বর , পুরী থেকে তারা তারিণী পর্যন্ত ট্যাক্সি পরিষেবা পাওয়া যায় এবং ব্রহ্মপুর থেকে তারা তারিণী জংশন পর্যন্ত নিয়মিত বাস পরিষেবাও পাওয়া যায়।
নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল ব্রহ্মপুর রেলওয়ে স্টেশন , মন্দির থেকে 32 কিমি দূরে।
তারা তারিণী ধাম হলো মাতৃশক্তির পীঠস্থান, তন্ত্রসাধনার আঁতুর ঘর, এখানে আছে মানুষের আস্থার গল্প।সুতরাং আপনারাও চলে আসতে পারেন এখানে। মন্দিরের স্থাপত্য আর মন্দিরের উপর হতে বয়ে চলা ঋষিকূল্য নদী, দেখতে দেখতে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন। তবে সাবধান ! মন্দির চত্বরে অজস্র বানর সেনার উপস্থিতি। আপনার হাত থেকে প্রসাদের থালা, আপনার হাতের খাবার, কেড়ে নিয়ে চলে যাওয়াই এদের মূল লক্ষ্য।বাঁদরামীটা একটু বেশি বেশিই মনে হয়।














Mr Amit Bhattacharya expressed his thought as.....
ReplyDeleteExceptional narrative... with excellent clicks ☺️💖
শ্রী সচীবিলাস রায় বলেছেন --
ReplyDeleteতথ্যবহুল লেখা, পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। এইরকম লেখা আরও চাই। সুন্দর বর্ণনা, এ যেন ঘরে বসেই মা তারা-তারিণী মন্দির দর্শন হয়ে গেল।
শ্রীমতি সন্ধ্যা বোসের মন্তব্য এই রকম ______
ReplyDeleteলেখা ও ছবি গুলো দারুন লাগলো অনেক অনেক কিছু তথ্য জানতে পারলাম। ভালো থাকবেন ও আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করবেন।🙏🙏
শ্রী সুভাষ নন্দী বলেছেন -----
ReplyDeleteআমি সম্প্রতই এই মন্দির দর্শন করে এসেছি।
শ্রী কল্লোল বসুর মতামত এই রকম ::==
ReplyDeleteখুব তথ্য সমৃদ্ধ লেখা । মা আপনি বরাবরই লেখেন। আমি ফেসবুক এ কমেন্ট
করতে পারিনা। তাহলে ওখানেই লিখতাম। ছবির এবং বর্ননা দুই খুব সুন্দর।
কল্লোল বসু।
শ্রী হরদাস চক্রবর্তী মহাশয়ের মূল্যবান মন্তব্য করেছেন ......
ReplyDeleteস্নেহাশিসদা র তথ্য সমৃদ্ধ লেখায় কোন ফাক ফোকর খুজতে গেলে দূরবীন লাগবে। তার চেয়ে লেখার দিকে চোখ গেলে বহতা নদীতে নৌকা চালানোর মত সকল বাধা দুর করে গন্তব্যে পৌছে যাওয়া যায়। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ও তথ্য সমৃদ্ধ লেখার জন্য অজানা জায়গা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, লেখা গুলো আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে এস আনন্দ নাও, নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ করে জীবনের আনন্দ উপভোগ কর। লেখক ও লেখনী দীর্ঘজীবী হোক এই প্রার্থনা করি।
Mr Raren Chakraborty has expressed......
ReplyDeleteOpurbo, khub bhalo laglo.🙏
Mr Chatrapati Bhowmik has expressed his thought ::
ReplyDeleteমা তারা তারিণী মন্দিরটি একেবারে পুরী মন্দিরের রিপ্লেকা । এরকম আছে জানা ছিলো না। পুরী মন্দিরের বয়স ১০০০-১২০০ বছর পুরনো। এটাতো দেখছি আরও ৮০০-১০০০ বছর পুরনো। লেখাটা থেকে অ - অনেক কিছু জানতে পারলাম। স্নেহাশীষদাকে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ।
Chatrapati Bhoumik