জ্যোতির্ময় মহাকাল দর্শন

 

দক্ষিণমুখী  জ্যোতির্লিঙ্গ শিবের বিগ্রহ--- মহাকালেশ্বর 





শিবাবতার আচার্য শঙ্কর অগনিত শিবলিঙ্গ মূর্তির মধ্য থেকে ১২টি শিবলিঙ্গকে জ্যোতির্ময় বলে চিহ্নিত করেন। এই লিঙ্গগুলি স্বয়ম্ভূ   এবং এগুলিকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলে। এইসব জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন, পূজা ও স্মরনে, মানুষের জীবনে প্রভূত কল্যাণ ও আনন্দ আসে। এই কারণেই শত শত বছর ধরে মানুষ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনে যান। গুজরাটের ভেরাবলে অবস্থিত সোমনাথ মন্দিরটি বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম বলে  মনে করা হয়। মহাদেবের তৃতীয় জ্যোতির্লিঙ্গ মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে অবস্থিত।  এখানে মহাদেবের প্রকাশ মহাকাল রূপে  এবং মহাকালেশ্বর শিব নামে পরিচিত।   মহাকালের অর্থই কালের অধিপতি। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর শিবও ঠিক তেমনটাই নির্দেশ করেন। মহাকালেশ্বরই ভারতের একমাত্র দক্ষিণমুখী জ্যোতির্লিঙ্গ শিবের বিগ্রহ। মহাকালের পুজা ও দর্শন করলে নিজ এবং আত্মীয়-স্বজনদের অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এমনকি ভক্তের দীর্ঘায়ু বর প্রাপ্তি হয়।








উজ্জয়িনী একটি প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শহর যা ৫০০০ বছরের পুরানো। ব্রহ্ম পুরানে এটিকে এক শ্রেষ্ঠ নগরী হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে। এই শহরের একটি গৌরব ইতিহাসও আছে। এই শহর ছিল একটা  বড় সাম্রাজ্যের রাজধানী। ধর্মগ্রন্থ অনুসারে এই নগরী কখনও ধ্বংস দেখেনি। ধ্বংসের দেবতা স্বয়ং মহাকালের বাস এখানে। পুরাণ অনুসারে, উজ্জ্বয়িনীকে আরও অনেক নামে ডাকা হয়। যেমন ....... অ) উজ্জয়িনী আ) প্রতিকল্প ই) পদ্মাবতী  ঈ) অবন্তিকা  উ) ভোগবতী  ঊ) অমরিবতী  ঋ) কুমুদবতী  ৡ) বিশালা  এ) কুশস্হি ইত্যাদি। শহরটি অবন্তী জনপদের রাজধানী ছিল বলে এটি অবন্তিকাপুরী নামে বিশেষ পরিচিত।  







পুরাণ ঘাটলে দেখা যাবে উজ্জয়িনী নামটি স্বয়ং মহাদেব রেখেছিলেন।  গল্পটা অনেকটা এইরকম ....... পুরাকালে ত্রিপুরাসুর নামে এক মহাপ্রতাপশালী দৈত্য ব্রহ্মার বরে উদ্দিপ্ত হয়ে দেবতাদের ওপর অত্যাচার করছিল। দেবতারা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমস্বরে আর্ত আবেদন করলে , ভোলানাথ  দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে অবন্তী নগরের মহাশ্মশানে উপস্থিত হলেন। এখানে তাঁরা ত্রিপুরাসুর বধের জন্য ধূপ, দীপ, বলি দিয়ে যথা উপাচারে  শ্রী শ্রী চন্ডী দেবীর আরাধনা শুরু করলেন। দেবী প্রসন্না হয়ে দেবাদিদেবকে পাশুপত অস্ত্র প্রদান করলেন এবং বললেন ---- এই অস্ত্রের মাধ্যমেই অসুর বধ হবে। তারপর মহাদেব সেই পাশুপত অস্ত্রের সাহায্য অসুরকে বধ করলেন।  মহাদেব এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন বলে ঋষিগন এই জায়গার নাম রাখলেন উজ্জয়িনী।  আবার এও উল্লেখ আছে যে ভগবান রাম নিজেই উজ্জয়িনীতে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্য উজ্জয়িনীতে শিপ্রা নদীর তীরে  সম্পন্ন করছিলেন  এবং যেখানে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল সেটিকে রামঘাট বলা হয়।   এরই পাশে রয়েছে বিরাট ফাঁকা মাঠ যেখানে পবিত্র কুম্ভ মেলা বসে।  এই ঘাটে পবিত্র শাহী স্নান হয়।  এই উজ্জয়িনীতে রাজা ভরতরীর গুহা পাওয যায় এবং বিশ্বাস করা হয় যে উজ্জয়িনীতে ভগবান বিষ্ণুর পায়ের ছাপ রয়েছে।







শিবলিঙ্গ আর জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে কি তফাত? আলোচনা করলে দেখা যাবে ______  শিবলিঙ্গের অর্থ হল অনন্ত।  যার সূচনা বা অন্ত নেই।  শিবলিঙ্গ আসলে শিব ও পার্বতী অদি-অনাদি একক রূপ। শিবলিঙ্গ পুরুষ ও প্রকৃতির সাম্যের প্রতীক। স্ত্রী বা পুরুষ কেউই সমাজে একা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না, তাই জানিয়ে থাকে। শিবলিঙ্গ মানব নির্মিত। এদিকে জ্যোতির্লিঙ্গ স্বয়ম্ভু শিবের অবতার। এখানে শিবের জ্যোতি রূপ প্রকট হয়। এটি মানব নির্মিত নয়। এগুলি স্বয়ম্ভু এবং সৃষ্টির কল্যাণ ও গতিশীলতা বজায় রাখে। সারা দেশে প্রচুর শিবলিঙ্গ আছে । কিন্ত জ্যোতির্লিঙ্গ শুধুই ১২টি। এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের কারনে পৃথিবীর ভিত্তি বজায় রয়েছে। এ কারনে পৃথিবী এখনও গতিশীল ও এখানে বসবাসকারী জীব জীবন যাপন করতে পারছে।






শিবের ৬৪টি রুপ রুয়েছে। এর মধ্যে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ। বেশ বড়ো গৌরিপটের উপর বড় কালো পাথরের মহাকালেশ্বরের সয়ম্ভু লিঙ্গ  অর্থাৎ প্রাকৃতিক  ভাবে এই  লিঙ্গের আবির্ভাব হয়েছে। জ্যোতির্লিঙ্গ সম্বন্ধে শিবপুরানে যে কাহিনী আছে সেটি এই রকম ............ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে একবার তর্ক হয়েছিল যে সৃষ্টিতে কে সর্বোচ্চ।  তাদের পরীক্ষা করার জন্য  , শিব  জ্যোতির্লিঙ্গ নামে একটি অন্তহীন আলোর স্তম্ভ  বিদ্ধ করেছিলেন।  বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা আলোর শেষ খোঁজ পেতে যথাক্রমে নীচের দিকে এবং উপরের দিকে স্তম্ভ বরাবর ভ্রমন করার সিদ্ধান্ত নেন।  ব্রহ্মা মিথ্যা কথা বলেছিলেন যে তিনি শেষ খুঁজে পেয়েছেন।  অন্যদিকে বিষ্ণু তাঁর পরাজয় স্বীকার করলেন।  শিব আলোর দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তাঁর অনুষ্ঠানগুলিতে কোনও স্থান থাকবে না যখন অনন্তকালের শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর  উপাসনা করা হবে। ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ অবস্থান ও নাম এই রকম ---- [১] গুজরাটের সোমনাথ  [২] অন্ধ্রপ্রদেশের মল্লিকার্জুন  [৩] মধ্যপ্রদেশের মহাকালেশ্বর [৪] মধ্যপ্রদেশের ওঁকারেশ্বর [৫] উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ  [৬] মহারাষ্ট্রের ভীমাশঙ্কর [৭] উত্তরপ্রদেশের বিশ্বনাথ [৮] মহারাষ্ট্রের ত্র্যম্বকেশ্বর  [৯] ঝাড়খণ্ডের বিশ্বনাথ  [১০] গুজরাটের নাগেশ্বর [১১] তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম এবং [১২] মহারাষ্ট্রের ঘৃষ্ঙেশ্বর। বিশ্বাস করা হয় এসব জ্যোতির্লিঙ্গে স্বয়ং মহাদেবের বাস। ঠিক কতদিন আগে এই জ্যোতির্লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা এক তর্কের বিষয়। তবে বর্তমানে এইসব মন্দিরই আজ শিবতীর্থে পরিনত হয়েছে।





লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে ভারতের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ একটি প্রগতিশীল সর্পিল আকারে অবস্থান করছে। যদি আপনি মানচিত্রে জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলির উপর একটি রেখা আকেন তবে চূড়ান্ত ফলাফলটি দেখা যাবে একটি শঙ্খ খোলের আকার বা ফিবোনাচ্চি প্যাটার্ন।  অনেকেই এই প্যাটার্নটিকে প্রকৃতির গোপন কোড বলে আখ্যা দেন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে হিন্দু ধর্মে জ্যোতির্লিঙ্গের গুরুত্ব কি ? ভারতে যে জ্যোতির্লিঙ্গগুলি রয়েছে তা আমাদের ঐতিহ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। জ্যোতির্লিঙ্গ মানে আলোর স্তম্ভ।  এটি ভগবান শিব  ও তাঁর শক্তির প্রকাশ।  সমস্ত জ্যোতির্লিঙ্গ আত্মার দু:খ দূর করবার ক্ষমতা রাখে। কারণ তারা সরাসরি একজনের আত্মাকে প্রভাবিত করে। ১২ টি জ্যোতির্লিঙ্গও ১২ টি রাশির সাথে মিলে যায় এবং তাদের থেকে দুর্দশা দূর করে। খুব সহজে বলতে গেলে বলতে হয় ..... জ্যোতি মানে ঐশ্বরিক আলো এবং লিঙ্গ মানে প্রতীক।  সুতরাং,  জ্যোতির্লিঙ্গ হল ঐশ্বরিক আলোর প্রতীক। 





রেলপথে কলকাতা থেকে কলকাতা-আমেদাবাদ এক্সপ্রেস,  হাওড়া থেকে শিপ্রা এক্সপ্রেস  আর শালিমার থেকে শালিমার-ভূজ এক্সপ্রেস ধরে সহজেই  উজ্জয়িনী যাওয়া যায়। ষ্টেশন থেকে আটো বা  টোটো নিয়ে দু কি মি দূরে মন্দিরে যাওয়া যেতে পারে। উজ্জয়িনী শহরে প্রচুর হোটেল, হোম ষ্টে বা ধর্মশালা রয়েছে। পচ্ছন্দ অনুযায়ী যে  কোনো জায়গায় থাকতে পারেন।








পবিত্র শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত উজ্জয়িনী শহরের প্রতিটি ধূলিকনায় মিশে আছে পুরাণ,  মহাভারত,  রামায়ণ,  ইতিহাস আর ঈশ্বরভক্তি। তাই এই শৈব, শাক্ত, বৌদ্ধ সংস্কৃতির শহর ছেড়ে কিছুতেই আসতে চাইবে না। তবু আমরা সাংসারিক জীব বলে আমাদের তো নিজ নিজ সংসারে ফিরে আসতেই হবে। তাই ফিরে যেতে যেতে মহাকালেশ্বরকে স্মরণ করে বলতে থাকি --------- ওঁ নম: মহাকালেশ্বরায় নম:। আবার যেন তোমার চরনে আসতে পারি।





Comments

  1. শ্রীমতি মানা দে তাঁর মতামতের বলেছেন ৴৲৴৲৴৲৴৲৴৲
    Joy mahakaleshwar baba
    Khoob hi sunder describe kara hoyeche, sabar bhagye jawa hoy na lekha ta pore o chobi gulo dekhe dhanyo holam.. Kintu ekta katha lekha hoy ni jeta onek besi important.... seta holo mahakaal thkei amader Indian time nirdharito hoy. Joy mahakaal

    ReplyDelete
    Replies
    1. Meena Dey

      হ্যা, আপনি ঠিকই বলেছেন। দুটো জিনিস আমি লিখিনি। প্রথম, আপনার ব্যক্তব্যটা। এ ব্যাপারটা নিয়ে বর্তমানে ভৌগলিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা রকম আলোচনা চলছে যাতে কিনা উজ্জয়িনীর সময়কে world time করা যায় কিনা। বিষদ ভাবে না জানার জন্য এবিষয়ে কিছু লিখিনি। দ্বিতীয়ত মহাকালেশ্বরের ভস্ম আরতি যেটা কিনা ভোর বেলায় হয় এবং এর জন্য special টিকিট কাটতে হয় এবং এটা দেখার জন্য মন্দিরের dress code অনুযায়ী পোষাক পরে যেতে হয়। এই আরতি ভারতবর্ষে শুধু এখানেই হয়। এটা আমি দেখেনি। তাই লিখতে পারিনি। এছাড়া এসব কিছুই লিখতে গেলে লেখাটা অনেক বড়ো হয়ে যেত। ইচ্ছা করেই একটু avoid করেছি।

      অনেক অনেক ধন্যবাদ এ ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন বলে। আশারাখি ভবিষ্যতেও এভাবে ভুল / ত্রুটির উল্লেখ করবেন যাতে কিনা লেখাগুলি আরও সুন্দর হয়।

      Delete
  2. শ্রী সনৎ ব্যানার্জী বলছেন ^^**^^**

    Asadharon barnana

    ReplyDelete
  3. Comment of Sree Raren Chakraborty <×><×><×>

    Ong Mahakaleshwar nomo. Opurbo bornona, khub bhalo laglo

    ReplyDelete
  4. শ্রীমতি সন্ধ্যা বোসের ব্যক্তব্য এই রকম +×+×+×+×+×+×+

    আপনার দ্বারা বর্ণিত মহাকালেস্বর জ্যোতির লিঙ্গের বর্ণনা খুব অসাধারণ লাগলো। সবাই কার শুভেচ্ছায় আমার বার টি জ্যোতির লিঙ্গ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।🙏🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. Sandhya Bose

      শুনে খুব ভালো লাগল যে আপনার ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গই দেখা হয়ে গেছে। সত্যিই আপনি অনেক পূন্য করেছেন। মহাদেবের অশেষ কৃপা রয়েছে আপনার উপর।

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog

রঘুরাজপুর, পটচিত্রের গ্রাম, পুরী।

আদালাজ স্টেপওয়েল

বড়ুভা ----- কুমারীসুলভা এক সমুদ্র সৈকত